সাজ্জাদ রাহমানের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হাছনরাজা মন’

0

এক
সকাল থেকেই লেমনের মেজাজটা ফুরফুরে। অনেক দিন পর একটা লং ড্রাইভের সুযোগ মিলল। বিশেষ করে মিরান্ডা যাবে শুনে ভেতরটা বেশ উষ্ণ। লালমাটিয়া থেকে উঠেছে মিরান্ডা। বিজয় স্মরণীয় মোড় থেকে পিক করেছে ডালিয়াকে, উত্তরা থেকে সুহানা। গাড়ির পেছনের সীটে ওরা তিনজন নানা গল্পে মেতে আছে। ফ্রন্ট মিররে চোখ দিয়ে মাঝে মাঝে দেখে নিচ্ছে লেমন। এর মধ্যে একবার মিরান্ডার সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। চোখ পড়তেই সরিয়ে নেয় মিরান্ডা। লেমন আবারো তাকায়, অপেক্ষা করে আবার কখন মিরান্ডা তাকাবে। কিন্তু তার সাড়া পাওয়া যায় না।
হাইওয়ে ধরে ছুটছে লেমনের গাড়ি। সাউন্ড সিস্টেমে চড়া ভ্যলুমে চলতে সদ্য প্রকাশিত হাছন রাজার একটি অডিও সিডি। গায়ক ছেলেটি নতুন পপ শিল্পী। ছেলেকে বিলেতের সেরা মিউজিক স্কুলে পড়িয়েছেন তার বাবা, যিনি নিজেও একজন নামকরা গায়ক। ছেলে গান কি শিখেছে সেটা বিবেচ্য নয়, আসার সময় নিয়ে এসেছে এক প্রযুক্তি। এখন আর গলার সুর থাকুক আর না থাকুক, গলা ভালো মন্দ তা বিচার না করলেও চলবে। শুধু মাইক্রোফোনে গানটা গেয়ে দিলেই হলো। বাকিটা করবে বিশেষ ওই সফট্ওয়্যার। যন্ত্রের কল্যাণে এখন বেসুরো গলাও সুরেলা।
একদিন নিউমার্কেটে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো লেমন। কানে ভেসে এলো ‘লোকে বলে বলেরে ঘর বাড়ি ভালানা আমার’। হাছন রাজার এই গানগুলো এদেশের বহু শিল্পী এর আগে গেয়ে গেছেন। কিন্তু এই প্রথম ওয়েস্টার্ন প্যাটার্নে এসে সেটা নতুন মাত্রা পেলো। ওই গানের সাথে নিজের কিছু মিল খুঁজে পায় লেমন। সে একজন আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি। বিলেত ঘুরে এসে তার সাথে যুক্ত হয়েছে এই নতুন মাত্রা। যেমন-বাংলাদেশে থাকতে লেমন সকালে মার হতে রুটি আর আলু ভাজা কিংবা ডিমের ওমলেট খেয়ে স্কুলে যেতো, এখন নাস্তার টেবিলে বার্গার, বাটার, পপকর্ণ উইথ মিল্ক আর কফি ছাড়া চলে না। বিলেত যাবার আগে লেমন পরতো হাফ হাতা শর্ট পাঞ্জাবি, বড়জোর ফতুয়া, ফুলশার্ট। এখন তার প্রধান পোশাক হচ্ছে টি শার্ট, জিন্স, মাঝে মাঝে থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট। ঢাকা কলেজের সামনে থেকে শার্ট আর গুলিস্তান থেকে প্যান্ট কিনতে অভ্যস্ত ছিলো সে। এখন সে জায়গায় যুক্ত হয়েছে ওয়েসটেক্স, ক্যাটস আই এর মতো বড়ো বড়ো ব্র্যান্ডগুলো। গানের ব্যাপারে অবশ্য তার রুচিটা অনেকটা মিক্সড এলবামের মতো। যখন যেটা ভালো লাগে সেটাই সই। ভাটিয়ালী-ভাওয়াইয়া থেকে শুরু করে পপ, ব্যান্ড, র‌্যাপ। মাঝে মাঝে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুলগীতিও চলে। কখনো ভোর বেলা লাগিয়ে দিলো ওস্তাদ বড়ে আলী মিয়ার রাগ। কখনো রাত্রি নিশিথে শোনা যাবে পুরনো দিনের ভারতীয় বাংলা। সে হিসেবে তাকে আধা বাঙালি আধা বিলেতি বললে ভুল হবে না।
তো আরেক বিলেত ফেরত বাঙালি হিসেবে ‘হ’ আধ্যাক্ষরের সেই গায়ক ছেলেটির বানোনো গানগুলো লেমনের ভারি পছন্দ হয়েছিলো সেদিন। নিউ মার্কেট থেকে আসার সময় একটি সিডি কিনে বাসায় ফিরেছিলো সে। ঐদিন থেকে সপ্তাহ খানেক গাড়িতে অনবরত চলছে এটি। লেমনের স্বভাব হচ্ছে নতুন একটি এলবাম কেনার পর বার বার শোনা। দুই তিন সপ্তাহতো বটেই; কখনো কখনো মাস গড়িয়ে যায়। আরেকটি নতুন এলবাম তাকে মুগ্ধ করার আগ পর্যন্ত গানগুলো বাজবে।
গানের সিডির মতোই বান্ধবী পাল্টায় লেমন। পছন্দের ক্ষেত্রে তরুণীর স্থান সর্বাগ্রে। তবে বয়সের বেলায় কখনও কখনও শিথিলতাও লক্ষ্য করা যায়। সেখানে টিনেজ যেমন আছে, তেমনি পঁয়ত্রিশের কোঠার কোন বিগত যৌবনা নারীও। যতদিন মুগ্ধতা থাকবে চোখে, দৃষ্টিতে থাকবে মাদকতা, মনের গহীনে জাগরুক থাকবে তিয়াস- বন্ধুত্বের স্থায়ীত্ব ঠিক ততদিন। কখনো একজনের সাথে চালু অবস্থায় মাঝখানে অন্য কেউ উঁকি দিতে চাইলেও বাধা নেই। তার দৃষ্টি তখন অক্টোপাসের একাধিক লম্বা হাত হয়ে যায়। তখন তাকে সর্বভূক মনে হয়। কখনো এমন কারো আবির্ভাব ঘটে, তখন লেমনের মনে হয়Ñএর জন্যেইতো এতকাল অপেক্ষায় ছিলো সে। দীর্ঘসময় ধরে নিরামিষে ত্যক্ত বিরক্ত সারমেয় যেমন আমিষের সাক্ষাতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। লেমনের অবস্থা দাঁড়ায় তখন ঠিক সেরকম।
মাঝ রাস্তায় গাড়িটা প্রায় রোড ডিভাইডারের গা ঘেঁেষ চলে গেল। স্টিয়ারিং বাঁয়ে হালকা ঘুরিয়ে দ্রত আয়ত্বে আনলো লেমন। সামনেই রাজলক্ষী, তারপর আজমপুর। এর পর ভালো রেস্টুরেন্টের দেখা মিলবেনা। লেমন বাঁপাশে চেপে একটি নামকরা ফাস্টফুড দোকানের নীচে গাড়ি পার্ক করলো। মর্ডাণ রেস্টুরেন্টটির নাম বি অফ সি। বেস্ট ফ্রাইড চিকেন। ঢাকা শহরে এখন বিশ্বের নামকরা ফাস্টফুডের আদলে অনেক রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠছে। ভাবতে ভালোই লাগে লেমনের। তা না হলে বাংলার বুকে সদ্য গড়িয়ে ওঠা এই আধা ওয়েস্টার্ন আধা বাঙালি সোসাইটির প্রেসটিজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতোÑভাবতেই কষ্ট হয় তার।
গাড়ির দরজা খুলে আগে নামে লেমন। বাকিদের ইশারা করলে ওরাও তাকে অনুসরণ করে। সিঁিড় ভেঙে দোতলায় উঠতে থাকে ওরা।
সকাল এগারোটার রেস্টুরেন্ট পুরো ফাঁকা। চারটা বিফ বার্গার, চিকেন ফ্রাই, ফ্রেন্স ফ্রাই আর ড্রিংক্স এর অর্ডার দিয়ে একটা বড় টেবিলে গোল হয়ে বসে ওরা। মিরান্ডার দিকে তাকায় লেমন। মিরান্ডার চুলগুলো কোঁকড়ানো, খয়েরী রং করা। ওর চোখগুলোই বেশি টানে লেমনকে। পারফেক্ট ক্যাটস আই। মিরান্ডা ঘোলা চোখে একবার লেমনকে দ্যাখে। লেমনের চোখ খাবারের কাউন্টারে উসখুস। খাবারের কাউন্টারে উসখুস। লেমন পরেছে ব্লু জিন্সের প্যান্টের সাথে সাদা টি শার্ট। গলায় গোল পিতলের চাকতির একটা লকেট। চাকতির মাঝখানে প্যাগোডার আকৃতির এ্যাম্বুশ করা ছবি। কিছুদিন আগে নেপাল যাবার পর শখ করে কিনেছে। গলায় একটা কিছু পরা লেমনের কিশোর বেলা থেকে অভ্যাস। একদিন মার সাথে দোকানে যাবার পর মা বোন রোদেলার জন্যে একটা চেইন পছন্দ করেছিলেন। লেমন আবদার করলো ওকেও তেমন কিছু একটা কিনে দিতে হবে। মা একটা লকেট কিনে দিয়েছিলেন। বন্ধুদের প্রশংসা পেয়ে লকেট পরা লেমনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। মিরান্ডা পরেছে টাইট জিন্সের প্যান্ট, সাথে শর্ট শার্ট। সাদা আর বাসন্তি রঙে রাঙ্গা শার্টের আভায় মিরান্ডার চেহারায় এই সকালেও যেন বিকেল নেমে এসেছে। সুহানা পরেছে মি শার্ট, সাথে কালো প্যান্ট। পোষাকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ডালিয়া। সে পরেছে হাল ফ্যাশনের একটা থ্রি পিস।
খাবার রেডি হয়ে যাওয়ার লেমন উঠে দিয়ে ট্রে নিয়ে এলো। যে যার মতো ট্রে থেকে খাবার নামিয়ে রাখলো। কোন ভূমিকা না করে বার্গারে কামড় দিলো লেমন। মিরান্ডার ঠোঁটে ততক্ষণে ড্রিংক্স এর স্ট্র, সুহানা আর ডালিয়া খাচ্ছে ফ্রেন্স ফ্রাই। লেমন মুখ খুললো প্রথমে।
কি ব্যাপারে। তোমরা দেখছি সবাই চুপচাপ। কেউ কোন কথা বলছোনা যে?
সুহানা হেসে উঠলো। ডালিয়া তাকালো মিরান্ডার দিকে। মিরান্ডা নির্বিকার।
ডালিয়া বললো ‘খাবারের সময় কথা বলতে হয়না।’ লেমন অবাক হওয়ার ভান করে।
কেন?
গুনাহ হয়। ধর্মগ্রন্থে পড়েছি
ও গড!
সুহানা হাসলো। বলল
তুই, এতো ধার্মিক হলি কবে থেকে রে ডালিয়া?
এখানে ধার্মিকতার কি দেখলি?
বারে, ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স টেনে কথা বলবি আর তোকে ধার্মিক বললে দোষ?
ধর্মগ্রন্থ পড়লেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না। ধর্ম পালনের বিষয়।
তাহলে তুই অধার্মিক?
ইশ। তুই থামবি? এজন্য তোদের সঙ্গে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।
ডালিয়া তার খাবার নিয়ে গটগট করে সোজা উঠে চলে যায়। ওদিক থেকে চোখ সরিয়ে লেমন কিছু বলতে গিয়ে হা করার আগে ডালিয়া কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে। সুহানা হাসতে থাকে। এক টুকরো বার্গার গিলে লেমন বলে
সুহানা। তোমার নাম সুহানা না হয়ে সুহাসিনি হওয়া উচিত ছিলো
কেন?
এইযে তোমার ঠোঁটে সবসময় হাসি লেগে থাকে।
মিরান্ডার গলায় বার্গার আটকে যায়। সে খানিকটা কেশে ড্রিংক্স মুখে দেয়।
সুহানা খুশি হয়ে আরেক প্রস্থ হাসে। বলে-
এক্ষেত্রে মিরান্ডাকে কি বলবো? ও’ তো কোন কথাই বলছেনা।
লেমন মিরান্ডার দিকে তাকায়। মিরান্ডার দৃষ্টি একেবারে লেমনের চোখে। লেমন চোখ সরিয়ে খানিকটা ধরা গলায় বলে ওকে নিয়ে কিছু বলার সময় এখনো আসেনি। আগে দেখি। তারপর বলবো।
এবার মিরান্ডা সুহানার দিকে তাকায়। টেবিলের নিচে একটা পা আরেকটা পায়ের উপর তুলে খানিকটা দুলাতে থাকে সে। সুহানা কি বলবে খুঁজে পায় না। তাকে কিছুটা নার্ভাস লাগে। আপন মনে খেয়ে চলে। লেমনের দৃষ্টি মিরান্ডার দিকে। মিরান্ডা এবার আর তাকাচ্ছেনা। লেমনকে খানিকটা অপ্রস্তুত মনে হয়। খাবার শেষে ওরা নিচে নেমে আসে। গাড়ির সামনের সীটে বসে আছে ডালিয়া। ডালিয়া লেমনের অনেক পুরনো বন্ধু। এ অধিকারটা তার আছে। লেমন খানিকটা অবাক হলেও উঠে বসে। স্টার্ট দেবার এক মুহূর্ত আগে সে পেছনে তাকায়। ততক্ষণে ওরা উঠে বসেছে। শব্দ তুলে ইঞ্জিন চালু হয়ে যায়। দ্রুত পাশের খালি জায়গায় ধুলো উড়িয়ে, চাকার খসখসে শব্দ তুলে থেকে রাস্তায় চলে আসে লেমনের গাড়ি। ছুটতে থাকে বন্য জানোয়ারের মতো। লেমন অডিও সিস্টেম অন করে। বেজে ওঠে হাবিবের যান্ত্রিক গলা-‘লোকে বলে বলেরে…ঘর বাড়ি ভালানা আমার…।’

(চলবে)

Follow and like:

Leave A Reply